Next Narayanganj

রবিবার, সেপ্টে ১৩, ২০২৬
রবিবার- ১৩, সেপ্টে, ২০২৬

আকস্মিক বন্যা কেন হয়, কীভাবে আগাম সতর্ক হওয়া সম্ভব?

admin@nextnarayanganj.com
নিউজ ডেস্ক
6 Min Read
নেপালে আকস্মিক বন্যায় তছনছ অনেক এলাকা। ছবি: আল-জাজিরা।

নেপালে আকস্মিক বন্যা বা ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’-এ ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আট শতাধিক মানুষ। তিব্বতের দিকে নিখোঁজের সংখ্যা সাড়ে পাঁচশর বেশি বলে জানা গেছে। তবে তিব্বত ও নেপালে নিখোঁজের এই সংখ্যা পরস্পরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এর আগে আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ বন্যার তুলনায় ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ অনেক বেশি আকস্মিক এবং ধ্বংসাত্মক হতে পারে।

ফ্ল্যাশ ফ্লাড কী?

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সংজ্ঞা অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যা হলো অল্প সময়ের মধ্যে হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া প্রবল পানির স্রোত, যা গিরিখাত, সংকীর্ণ খাদ, উপত্যকা কিংবা নিচু এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের বন্যা প্রায় যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে।

সাধারণ বন্যায় নদ-নদীর পানি ধীরে ধীরে বাড়ে। অনেক সময় টানা কয়েক দিন বা এক সপ্তাহের বেশি সময়ের বৃষ্টিতে নদীর পানি বেড়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

তবে আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হানের মতে, মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই কোনো কোনো এলাকায় ব্যাপক বন্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি শুকনো থাকা নদী বা খালও অল্প সময়ের মধ্যে পানিতে ভরে কূল ছাপিয়ে যেতে পারে।

কীভাবে সৃষ্টি হয় আকস্মিক বন্যা?

আকস্মিক বন্যার প্রধান কারণ অতিবৃষ্টি। তবে বজ্রঝড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ে তুষার বা বরফ দ্রুত গলে যাওয়া, বাঁধ ভেঙে যাওয়া কিংবা ভূমিধস থেকেও এ ধরনের বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টিপাতের তীব্রতা, কোথায় বৃষ্টি হচ্ছে এবং কতটা এলাকায় হচ্ছে—এসব বিষয় আকস্মিক বন্যার গতি ও বিস্তৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি এলাকার ভূপ্রকৃতিও বন্যার ভয়াবহতা বাড়াতে পারে।

পাহাড় বা টিলার মতো খাড়া ঢালযুক্ত এলাকায় পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে। আবার শক্ত মাটি, পাথর, পাকা সড়ক ও ভবনের ছাদের মতো পানি শোষণ করতে না পারা পৃষ্ঠ বেশি থাকলেও পানি দ্রুত প্রবাহিত হয়ে নিচু এলাকা প্লাবিত করতে পারে।

সাম্প্রতিক দাবানলে যেখানে বিস্তীর্ণ এলাকার গাছপালা ও উদ্ভিদ পুড়ে গেছে, সেসব স্থানেও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অন্যদিকে মৃদু ঢাল, ঘন উদ্ভিদ এবং পানি শোষণ করতে সক্ষম মাটিযুক্ত এলাকায় পানি তুলনামূলক ধীরে প্রবাহিত হয়। ফলে সেখানে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা?

বিজ্ঞানীদের মতে, উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্প ধারণের সক্ষমতাও বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় তাপমাত্রা প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতার ঘনত্ব প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প জমা হলে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও বাড়ে। এর ফলে যেসব অঞ্চলে আগে থেকেই আকস্মিক বন্যার প্রবণতা রয়েছে, সেখানে এ ধরনের বন্যার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হতে পারে।

নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় হয়নি বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

আগে থেকে কি ফ্ল্যাশ ফ্লাডের পূর্বাভাস পাওয়া যায়?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকস্মিক বন্যারও পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। তবে এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সময়।

সাধারণ মৌসুমি বন্যার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আগাম প্রস্তুতির জন্য তুলনামূলক বেশি সময় পাওয়া যায়। কিন্তু আকস্মিক বন্যা খুব দ্রুত সৃষ্টি হওয়ায় সতর্ক হওয়ার সুযোগ অনেক কম থাকে।

সরদার উদয় রায়হান বলেন, বড় নদীর অববাহিকায় তথ্য সংগ্রহ তুলনামূলক সহজ। কিন্তু আকস্মিক বন্যা সাধারণত পাহাড়ি অববাহিকায় দেখা দেয়। দুর্গম এলাকায় হাইড্রোলজিক্যাল ও মেটারোলজিক্যাল স্টেশন কম থাকায় দ্রুত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার আগাম পূর্বাভাসকে একটি নির্ভরযোগ্য ‘লিড টাইম’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে রাডার, স্যাটেলাইট ও স্বয়ংক্রিয় সেন্সরের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা চলছে।

প্রাণহানি কমাতে কী করা যায়?

নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ ঠাকুরি বলেন, এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

হিমবাহ ও এর আশপাশে স্থাপন করা আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা হ্রদের পানির স্তর ও বাঁধের পরিস্থিতি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য দিতে পারে। সময়মতো এ তথ্য পাওয়া গেলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংঘটিত দুর্যোগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সরকারি পর্যায়ের সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলচক ক্যাম্পাসের ডিজাস্টার স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক বসন্ত অধিকারীর মতে, সীমান্তবর্তী ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মানুষের মাধ্যমে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান কঠিন। তাই এসব অঞ্চলে স্যাটেলাইট স্টেশন স্থাপন করে নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি না গড়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়

নেপালের কিছু নদী অববাহিকায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু থাকলেও হিমালয় অঞ্চলে এর ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলেই হবে না। কোন এলাকাগুলো আকস্মিক বন্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, তা চিহ্নিত করে সেসব এলাকায় নতুন করে জনবসতি গড়ে তোলা বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে নদীর তীর ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে।

কারণ আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হলো—ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের বসতি না রাখা এবং দুর্যোগের আগে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া। সূত্র: বিবিসি বাংলা

Share This Article