Next Narayanganj

রবিবার, সেপ্টে ১৩, ২০২৬
রবিবার- ১৩, সেপ্টে, ২০২৬

খালে বর্জ্য, পাড়ে দখল: বন্দরের লাউসারে পানির নিচে শতাধিক পরিবার

admin@nextnarayanganj.com
বন্দর প্রতিনিধি
4 Min Read
কালাখাল নামে পরিচিত আতুরাখালের বর্তমান চিত্র। ছবি- সংগৃহীত।

খাল দখল, ভরাট ও শিল্পকারখানার বর্জ্যে পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ায় নারায়ণগঞ্জের বন্দরের লাউসার এলাকায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ‘কালাখাল’ নামে পরিচিত আতুরাখাল এখন পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা হারানোয় সামান্য বৃষ্টিতেই শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে খালের বিভিন্ন অংশে মাটি, বালু ও আবর্জনা ফেলে ভরাট করা হয়েছে। কোথাও খালের জায়গা দখল করে দোকান ও স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। এর সঙ্গে আশপাশের টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানার বর্জ্য খালে মেশায় পানি কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে লাউসার থেকে মদনপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত খালের বিভিন্ন অংশে পানি প্রবাহের প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়। কোথাও বাঁশের কাঠামো তৈরি করে দোকান বসানো হয়েছে, আবার কোথাও খালের পাড় ভরাট করে জায়গা দখল করা হয়েছে। পানিতে ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিক, কাপড়ের টুকরা ও গৃহস্থালির আবর্জনা। কয়েকটি স্থানে পানির ওপর রঙিন ফেনাও দেখা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্পকারখানার তরল বর্জ্য খালে পড়ার কারণে পানির রং ও দুর্গন্ধের এমন অবস্থা হয়েছে।

লাউসারের বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম বলেন, আগে বৃষ্টির পানি খাল দিয়ে দ্রুত নেমে যেত। এখন খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই বাড়িঘর ও রাস্তায় পানি উঠে যায়। কারখানার বর্জ্যে খালের পানি কালো হয়ে যাওয়ায় ব্যবহারযোগ্য পানির সংকটও তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।

রিপা আক্তার নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ঘরে ঢুকে পড়া পানি নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। শিশুদের পানির মধ্য দিয়েই স্কুলে যেতে হচ্ছে। এতে তাদের শরীরে চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। আরেক বাসিন্দা বলেন, পানিবন্দী হয়ে পড়লেও তাদের অন্যত্র যাওয়ার সুযোগ নেই। ঘরে হাঁটুসমান পানি জমে আছে। পানির কারণে পায়ে চুলকানিসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। এমনকি কয়েকটি হাঁসও মারা গেছে বলে জানান তিনি।

স্থানীয়রা জানান, একসময় আতুরাখাল ছিল এ এলাকার পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বর্ষার পানি ও আশপাশের বসতবাড়ির অতিরিক্ত পানি এই খাল দিয়ে বের হয়ে যেত। কিন্তু দীর্ঘদিনের দখল, ভরাট ও বর্জ্য ফেলার কারণে সেই খালই এখন জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মদনপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন জানান, কিছুদিন আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরেজমিনে এলাকাটি পরিদর্শন করে খাল পরিষ্কারের উদ্যোগ নেন। সাময়িকভাবে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করায় তখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। তবে খালের বিভিন্ন স্থানে আবারও দখল ও ময়লা জমে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, লাউসারের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগে রয়েছেন। বিশেষ করে শিশুদের স্কুলে যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। খালটি দখলমুক্ত করে স্থায়ীভাবে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের পাশে থাকা জামাল টেক্সটাইল প্রাইভেট লিমিটেডের অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলা হচ্ছে। তাদের দাবি, এতে খালের পানি দূষিত হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মদনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিবানী সরকার বলেন, এর আগে জলাবদ্ধতার খবর পেয়ে তিনি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছিলেন।

আবারও এলাকায় পানি জমার খবর পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ইউএনও বলেন, জলাবদ্ধতার পেছনে শুধু অতিরিক্ত পানি নয়, পানি বের হওয়ার পথের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাও বড় কারণ। খালের বিভিন্ন অংশে অবৈধ স্থাপনা, দোকানপাট ও দখলের কারণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পানি চলাচলের পথে থাকা অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

শিবানী সরকার বলেন, শুধু খাল পরিষ্কার করে সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। খাল দখলমুক্ত করার পাশাপাশি পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ নিশ্চিত করতে হবে।

স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে খালের যেসব স্থানে পানি আটকে যাচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

Share This Article